অবহেলিত গাইবান্ধা শহরের আদিকথা


ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার ভেতরে গাইবান্ধা শহর। নাম হয়েছে ‘পকেট শহর’। কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। জেলায় মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের চিনিকলটি (রংপুর চিনিকল) ছাড়া আর কোনো বড় শিল্পকারখানা নেই। সেটিও আবার প্রতিবছর লোকসান গোনে। আর আছে গোটা দুই হিমাগার ও কয়েকটি অটো চালকল।

গত কয়েক দিন শহরের শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিজেদের শহর নিয়ে গভীর আক্ষেপ ও মনঃকষ্ট রয়েছে তাঁদের। জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মিহির ঘোষ বলেন, বাইরে কোথাও থেকে ফিরে গাইবান্ধা শহরে ঢুকেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, গাইবান্ধা মহকুমা হয় ১৮৫৮ সালে। এর ১২৬ বছর পর জেলা হয়েছে ১৯৮৪ সালে। গাইবান্ধার সঙ্গে একই বছর আরও অনেক মহকুমা জেলা হয়েছে। অথচ অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা—সবদিক থেকে সেসব জেলা গাইবান্ধার থেকে অনেক এগিয়ে গেছে। গাইবান্ধার কোনো উন্নয়ন হয়নি। যেমন এখন প্রায় ৮০ শতাংশ জেলা শহরে আগের ১০০ শয্যার হাসপাতাল ২৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। গাইবান্ধার হাসপাতাল সেই ১০০ শয্যারই আছে। অনেক জেলায় মেডিকেল কলেজ হয়েছে; হয়েছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃষিসহ সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়। গাইবান্ধায় এসব কিছুই হয়নি।
যোগাযোগব্যবস্থাই গাইবান্ধার এই পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ বলে মনে করেন জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শাহজাদা আনোয়ারুল কাদির। তিনি বলেন, গাইবান্ধা কিন্তু একটা সময় খুব জমজমাট ব্যবসার এলাকা ছিল। নদী ছিল প্রধান যোগাযোগমাধ্যম। গত শতকের ষাটের দশকের শুরুতে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক তৈরি হলে নদীপথের গুরুত্ব কমতে থাকে। গাইবান্ধা পড়ে গেল মহাসড়ক থেকে অনেক দূরে, প্রায় বিচ্ছিন্ন এক অবস্থানে। ওদিকে স্বাধীনতার পর থেকে ট্রেনের ব্যবস্থাও খারাপ হতে থাকে। অনেক ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থা থেকে গাইবান্ধা আর বের হতে পারছে না।
গাইবান্ধা শহরের লেনদেন, বেচাকেনা যা কিছু সব নিজেদের লোকজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সালিমার মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাপ্পা সাহা বলেন, গাইবান্ধা ছোট শহর। মূলত ডিবি রোড ও স্টেশন রোডকেন্দ্রিক দোকানপাট নিয়েই এ শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য। সাধারণত দেখা যায়, জেলা শহরেই বড় হোলসেলের দোকানগুলো থাকে। সেখান থেকে উপজেলার খুচরা বিক্রেতারা মালামাল কিনে নিয়ে যান। গাইবান্ধায় ঠিক এর উল্টো। মূলত গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ীতে গড়ে উঠেছে বড় ব্যবসাগুলো। সেখান থেকে গাইবান্ধা শহরের খুচরা বিক্রেতারা মালামাল নিয়ে আসছেন। বেসরকারি ব্যাংক, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কেন্দ্র, হোলসেলের দোকান—সবই মহাসড়কসংলগ্ন ওই উপজেলাগুলোতে।
গাইবান্ধা কৃষিপণ্যনির্ভর। বিশেষত ধানের উদ্বৃত্ত জেলা। বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টন ধান এখান থেকে বাইরে যায়। ইদানীং প্রচুর ভুট্টা ও কলার চাষ হচ্ছে। ডিবি রোডের নবারুণ বাণিজ্য সংস্থার মালিক দেওয়ান মশিউর রহমান বলছিলেন, জেলার অন্য উপজেলার তুলনায় ঢাকা থেকে গাইবান্ধায় এক ট্রাক মাল আনতে বা পাঠাতে অন্তত তিন থেকে চার হাজার টাকা বেশি খরচ হয়। ফলে এখানে দামও পড়ে বেশি।
গাইবান্ধায় ছোটখাটো কিছু শিল্প ও কুটিরশিল্প যা-ও আছে, সেখানে পুঁজির সংকট তীব্র। শিক্ষক বিরতি রঞ্জন সরকার বলছিলেন, শহরে ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া ঝক্কির। এই সুযোগে সুদের কারবার খুব জমে উঠেছে। বিশেষ করে ব্যক্তিপর্যায়ে সুদের ব্যবসা খুবই জমজমাট। ফলে সুদের সহজ ব্যবসা বাদ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে কেউ কলকারখানা বা অন্য কোনো বিনিয়োগে যান না।
তাহলে এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার উপায় কী? সবাই এক কথায় বলেন, নতুন কয়েকটি সড়ক ও সেতুর কথা। ব্রহ্মপুত্র নদে বালাসি, বাহাদুরাবাদ সেতু নির্মাণ জেলাবাসীর প্রাণের দাবি। এ ছাড়া রংপুর থেকে পীরগাছা, গাইবান্ধা হয়ে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত একটি মহাসড়ক নির্মাণ করা দরকার। গাইবান্ধা থেকে সাদুল্লাপুর, বড় দরগা হয়ে রংপুর পর্যন্ত যে সরু সড়কটি আছে, সেটি প্রশস্ত করে আঞ্চলিক মহাসড়কে পরিণত করা। এর পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ করা হলে গাইবান্ধার সঙ্গে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হবে। পকেট শহরের দুর্নাম ঘুচবে।
যোগাযোগব্যবস্থার পাশাপাশি সদর হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা, কৃষি ইনস্টিটিউটকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় করা, পরিত্যক্ত ঘাঘট নদকে বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত করা, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত একটি মিলনায়তন তৈরি করা জেলাবাসীর বহুদিনের দাবি। কিন্তু তা কবে হবে সেই প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন গাইবান্ধাবাসী।