বিদেশ যেতে মেডিকেল চেকআপের নামে নানা অনিয়ম ও হয়রানি ।


‘সিলেট থেকে নাইট কোচে এসে ভোর ৬টায় লাইনে দাঁড়াইছি। এখন বেলা আড়াইটা বাজে। সারাদিন পানি আর বিস্কুট ছাড়া কিছু খাই নাই। মাথা ঘুরাইতেছে, এভাবে লাইনে দাঁড়াইয়া থাকলে মারা যাব।’ মঙ্গলবার দুপুরে গুলশানে জিসিসি অ্যাপ্র“ভড মেডিকেল সেন্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (গামকা) অফিসের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলেন সৌদি আরব যেতে ইচ্ছুক শ্রমিক ইসরাফিল হোসেন। তখনও লাইনে দাঁড়িয়ে আছে তার মতোই ৫ হাজারের বেশি নারী-পুরুষ শ্রমিক। সবাই এসেছেন মেডিকেল চেকআপ স্লিপের জন্য। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর নজিরবিহীন ভোগান্তির কথা।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান সংশ্লিষ্ট শ্রমিক, রিক্রুটিং এজেন্সি, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত গামকা সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যেতে ইচ্ছুক লাখ লাখ শ্রমিক। সিন্ডিকেটটি মেডিকেল চেকআপের নামে একচেটিয়া মনোপলি ব্যবসা করছে। ইচ্ছেমতো ফি আদায় করছে। দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকতে হয় শুধু একটি স্লিপের জন্য। আর এ সময় প্রতারণার শিকার হতে হয় দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।
গামকায় হয়রানির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, আমাদের কাছে এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেনি। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অভিযোগ পেলে গামকার কার্যালয় বিকেন্দ্রীকরণসহ তাদের হয়রানি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জিসিসিভুক্ত (গালফ কো-অপারেটিভ কাউন্সিল) দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যেতে হলে শ্রমিকদের গামকা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে মেডিকেল চেকআপ করাতে হয়। এন্ট্রি স্লিপের জন্য গামকায় দিতে হয় ৩০০ টাকা। রক্তের এইচআইভি, মূত্র পরীক্ষাসহ কয়েকটি পরীক্ষা ও বুকের একটি এক্সরের জন্য জনপ্রতি মেডিকেল সেন্টারে জমা দিতে হয় ৫ হাজার টাকা। অথচ এসব চেকআপ দেড় থেকে দুই হাজার টাকায় অন্যত্র করানো সম্ভব।

চেকআপ করানোর আগে গামকার গুলশান-২ এর ৯৪ নম্বর সড়কের বাড়ি নং-৪/এ কার্যালয়ে গিয়ে পাসপোর্ট ও ভিসার তথ্য সার্ভারে এন্ট্রি করানোর পাশাপাশি ছবি তুলতে হয়। সেখান থেকে প্রিন্ট নিয়ে গামকার সদস্যভুক্ত ২৬টি মেডিকেল সেন্টারের কোনো একটিতে মেডিকেল চেকআপ করতে হয়। সিলেট ও চট্টগ্রামে আরও দুটি এন্ট্রি পয়েন্ট থাকলেও সবাই ছোটেন গুলশানে।
ছবি তোলা ও সার্ভারে তথ্য এন্ট্রির জন্য প্রতিদিন কাকডাকা ভোর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত হাজার হাজার বিদেশ যেতে ইচ্ছুক নারী-পুরুষ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। গত কয়েকদিন গুলশানে গামকার কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু করে পুরো সড়ক ঘুরে কানাডিয়ান হাইকমিশন পর্যন্ত লম্বা লাইন দেখা গেছে। সোমবার দুপুরে অঝোর বৃষ্টির মধ্যেও হাজার হাজার নারী-পুরুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। একই অবস্থা ছিল মঙ্গলবারও।
গামকা কার্যালয় সূত্র জানায়, তারা প্রতিদিন ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার নারী-পুরুষকে মেডিকেল চেকআপ স্লিপ দেন। গড়ে প্রতি মাসে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার, আর বছরে দাঁড়ায় ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ।
এই বিপুলসংখ্যক শ্রমিক গামকা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গামকার জেনারেল ম্যানেজার মো. লাহুয়ার রহমান যুগান্তরকে বলেন, প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ হাজার শ্রমিক মেডিকেল স্লিপের জন্য আসে। যার প্রায় ৭০ ভাগ সৌদি আরব যেতে ইচ্ছুক। সৌদিতে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ায় হঠাৎ এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা কয়েকদিনের মধ্যে ভাটারায় মাদানী এভিনিউতে নতুন একটি অফিস খুলছেন। সেখানে ৩০টি কাউন্টারের মাধ্যমে সৌদি আরবে যেতে ইচ্ছুকদের দ্রুত সেবা দেয়া হবে। তখন এই অচলাবস্থা কেটে যাবে।
হয়রানি, প্রতারণা ও অনিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাজার হাজার মানুষকে সেবা দিতে গিয়ে কিছু অনিয়মের অভিযোগ আসে। লাইনে দাঁড়িয়ে যদি কেউ দালাল বা প্রতারকের খপ্পরে পড়ে সে জন্য আমরা (গামকা) দায়ী নই। কারণ লাইন অনেক লম্বা হয়ে কানাডিয়ান হাইকমিশন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এত লোকজনকে নজরে রাখা গামকার কর্মীদের পক্ষে সম্ভব হয় না।
মঙ্গলবার লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় কথা হয় মানিকগঞ্জ থেকে আসা রোকসানার সঙ্গে। তিনি জানান, সৌদি আরব যাবেন গৃহকর্মীর ভিসায়। বিজয়নগরের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তিন লাখ টাকা জমা দিয়েছেন। সেখান থেকে ফোন পেয়ে রোববার ওই রিক্রুটিং এজেন্সিতে গেলে পাসপোর্ট ও ভিসার কপি দিয়ে গামকা অফিসে যেতে বলা হয়। সোমবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে নাম এন্ট্রি করতে পারেননি। এরপর আবার মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় গিয়ে লাইনে দাঁড়ান। বেলা ২টা পর্যন্ত তিনি বই জমা দেয়ার সুযোগ পাননি।
গামকার তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর হচ্ছে- আল-ফালাহ মেডিকম ক্লিনিক (বনানী), আলগোফ্লাই মেডিকেল সেন্টার (বনানী), আল-হুমায়রা হেলথ কেয়ার (বনানী), আল-মদিনা মেডিকেল সার্ভিস (বনানী), আল-রিয়াদ মেডিকেল চেকআপ (বনানী), অ্যারাবিয়ান মেডিকেল সেন্টার (বনানী), চাঁদশী মেডিকেল সেন্টার (বনানী), ফেয়ার ওয়েজ মেডিকেল সেন্টার (গুলশান-১), গ্রীন ক্রিসেন্ট হেলথ সার্ভিস (বারিধারা), গালফ মেডিকেল সেন্টার (বনানী), গুলশান মেডিকেয়ার (গুলশান সাউথ এভিনিউ), হেলথ কেয়ার সেন্টার (পশ্চিম পান্থপথ), ইবনে সিনা মেডিকেল চেকআপ ইউনিট (উত্তর বাড্ডা), আইআইআরও মেডিকেল সেন্টার (উত্তরা), ইন্টারন্যাশনাল হেলথ কেয়ার লি. (বনানী), লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার (নয়াপল্টন), মক্কা মেডিকেল সেন্টার (বনানী), মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিস লি. (ধানমণ্ডি), মাসকাট মেডিকেল সেন্টার (বনানী), নাফা মেডিকেল সার্ভিস (বনানী), ন্যাশনাল মেডিকেল সেন্টার (বনানী), নোভা মেডিকেল সেন্টার (বনানী), পালস মেডিকেল সেন্টার (বনানী), পুষ্প ক্লিনিক (কাকলী), সাইমন মেডিকেল সেন্টার (বনানী) ও সৌদি-বাংলাদেশ সার্ভিস কোম্পানি (বনানী)। এর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি বাদে বাকিগুলো নামসর্বস্ব।
সরেজমিন দেখা যায়, ভোর হওয়ার আগেই স্লিপ নিতে লাইনে দাঁড়ান লোকজন। বেলা বাড়ার সঙ্গে বাড়তে থাকে লাইনের দৈর্ঘ্য। ভিড় ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের রাস্তা, ফুটপাতেও। তাতেও পরিস্থিতি সামলানো যায় না। এ অবস্থায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ বিষয়ে সরেজমিন পরিদর্শন শেষে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি সরিয়ে নেয়ার আলটিমেটাম দিয়েছেন ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক।
এদিকে ভুক্তভোগী শ্রমিকদের অভিযোগ- দালাল, নিরাপত্তা প্রহরী ও পুলিশ টাকার বিনিময়ে সিরিয়াল ছাড়াই লোক ভেতরে ঢোকায়। ফলে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও আমাদের বঞ্চনার শিকার হতে হয়। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডা, হাতাহাতি লেগেই থাকে। মঙ্গলবার দুপুরেও দেখা যায়, গামকার নিরাপত্তা প্রহরীরা দুই যুবককে সিরিয়াল ছাড়া ঢুকতে দিয়েছে- এমন অভিযোগে হাতাহাতি লেগে যায়।
এছাড়া গামকা কার্যালয়ের সামনে রয়েছে অজ্ঞান পার্টি, প্রতারক ও দালালসহ বিভিন্ন ধরনের টাউট-বাটপার দলের দৌরাত্ম্য। চাঁদপুরের কচুয়া থেকে রোববার পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে গামকা কার্যালয়ে আসেন ইউসুফ আলী। প্রতারণার শিকার ইউসুফ আলী যুগান্তরকে জানান, এক দালাল তাকে এক ঘণ্টার মধ্যে স্লিপ এনে দেয়ার কথা বলে ৫০০ টাকা চায়। তিনি ৩০০ টাকা দেন। দালাল তার (ইউসুফ) ভিসা ও পাসপোর্ট নিয়ে ভেতরে যাওয়ার পর থেকে আর খোঁজ নেই।
রাজধানীর বিজয়নগরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক যুগান্তরকে বলেন, গামকা মূলত একটি প্রতারক সিন্ডিকেট। শ্রমিকদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করাই তাদের কাজ। বিভিন্ন সময় শ্রমিকদের বলে- এই রোগ আছে, সেই রোগ আছে, মেডিকেল আনফিট। যখন কিছু ঘুষ দেয় তখন আবার সব ফিট। অথচ গামকা থেকে স্লিপ নেয়ারই প্রয়োজন নেই। মেডিকেল সেন্টারগুলোতে ছবি তুলে স্লিপ দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চেকআপ করলে এবং কোয়ালিটি মেডিকেল সেন্টারের সংখ্যা বাড়ালে এত দুর্ভোগ হতো না।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, গামকা মূলত শ্রমিকদের হয়রানির একটি সিন্ডিকেট। তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও আইসিডিডিআরবির মতো প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল রিপোর্টও গ্রহণ করে না। অথচ তাদের তালিকাভুক্ত মানহীন প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট নেয়।